ডেইলি বাংলাগ্রাম

পুলিশের গাড়ি পুড়িয়ে ভিডিও পাঠানো হয় আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লার ভাগনের কাছে, এরপর তিনজনের ফোনে আসে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় এমন তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাঁদের কয়েকজনের মুঠোফোন পরীক্ষা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

মিরপুরে পুড়িয়ে দেওয়া পুলিশের গাড়ি
মিরপুরে পুড়িয়ে দেওয়া পুলিশের গাড়ি

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় এমন তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাঁদের কয়েকজনের মুঠোফোন পরীক্ষা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

পুলিশের ভাষ্য, অন্তত তিনজনের মুঠোফোন থেকে গাড়ি পোড়ানোর ছবি ও ভিডিও একটি নির্দিষ্ট নম্বরে পাঠানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেগুলো পাঠানোর পর ওই তিন আসামির মুঠোফোনে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে আসে।

যাঁর নম্বরে ছবি–ভিডিও পাঠানো হয়, তিনি আলিফ মোল্লা বলে দাবি পুলিশের। আলিফ আওয়ামী লীগের ঢাকা–১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাবেক এই সংসদ সদস্য বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।

ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান প্রথম আলোকে বলেন, গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁরা জানতে পেরেছেন, ঘটনার পেছনে ছিলেন আলিফ মোল্লা। গ্রেপ্তার কয়েকজনের মুঠোফোনে পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর ভিডিও পাওয়া গেছে। ছবি–ভিডিও পাঠানোর পর টাকা আসার প্রমাণও মিলেছে বলে জানান তিনি।

শ্রমিকদের দাবি ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা

ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই দিন ধরে শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি বর্তমান সাড়ে ১২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি করছেন।

সোমবারও মিরপুরে বিক্ষোভের চেষ্টা করেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। সকাল থেকে বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে তাঁরা বিচ্ছিন্নভাবে সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া দেয় এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে।

মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় সকাল থেকেই পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। গোলচত্বরে পুলিশের দাঙ্গা দমনের যান, জলকামানসহ বিভিন্ন যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়। পুলিশের বাধায় শ্রমিকেরা বড় ধরনের বিক্ষোভ করতে পারেননি। মিরপুর ১০ নম্বর ও আশপাশের সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল।

মজুরি বোর্ড গঠন, অনুপ্রবেশের অভিযোগ সরকারের

শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর জন্য রোববারই সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সরকারের বক্তব্য, আন্দোলনে মুখোশধারী এমন ব্যক্তিরা অনুপ্রবেশ করেছেন, যাঁরা শ্রমিক নন এবং দাবি আদায়ের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট নন। তাঁরাই সড়কে নৈরাজ্য তৈরি করছেন বলে অভিযোগ সরকারের।

সোমবার সকালে সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের সমর্থিত কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ ও আগুন জ্বালিয়ে অস্থিরতা তৈরির পেছনে যাঁরা ইন্ধন দিচ্ছেন, তাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

২৫টির মতো হোয়াটসঅ্যাপ–টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান পাওয়ার দাবি

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, তারা প্রায় ২৫টি হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের সন্ধান পেয়েছে। মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় নাশকতার জন্য লোক সংগঠিত করতে এসব গ্রুপ ব্যবহার করা হয়েছে বলে পুলিশের ভাষ্য।

কোথায় পুলিশ অবস্থান করছে এবং কোথায় জড়ো হয়ে ঘটনা ঘটাতে হবে—এসব বিষয়ে গ্রুপগুলো থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।

মোট গ্রেপ্তার ২৬ জন, ডিবির হাতে ১১

রোববার মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে পুলিশের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মোট ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ডিবি গ্রেপ্তার করেছে ১১ জনকে।

তাঁরা হলেন মাহমুদুর রহমান জুয়েল (৩৮), মো. অলিউল্লাহ অনিক (২০), মো. কামাল গাজী (৩২), আলিফ হোসেন ইমন (২৬), রমজান সরকার (১৮), মো. মাহিম মোল্লা (১৮), মো. জুবায়ের ইসলাম ওরফে জিসান (২২), মো. আরিফ আকন্দ (২৯), মোয়াজ্জেম শাহরিয়ার নিয়াজ (২৬), মো. আরিফ (১৮) ও মো. নাহিদ হাসান (১৮)।

সোমবার তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়। পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আদালতে তাঁদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠান।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের স্বজনদের পাওয়া যায়নি। ফলে পুলিশের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি।

পাঁচ মামলা, প্রতিটিতে অজ্ঞাতনামা এক হাজারের বেশি আসামি

মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পাঁচটি মামলা করেছে। মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাতনামা এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

সোমবার মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন-উত্তর) মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগের দিনের ঘটনায় শুধু শ্রমিকেরাই জড়িত ছিলেন, এমন নয়। তদন্তে শ্রমিকদের পাশাপাশি অন্য অপরাধীদের সম্পৃক্ততাও পাওয়া গেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আলিফ মোল্লার সংশ্লিষ্টতা, ছবি–ভিডিও পাঠানো এবং টাকা আসার বিষয়গুলো পুলিশের দাবি হিসেবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নির্দেশনা বা অর্থায়নের কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।