ডেইলি বাংলাগ্রাম

র‍্যাবের মোড়কে এসআরবি; আবারো সেই বন্ধুক যুদ্ধ: পরিবারের কাছ থেকে এজেহারে জোরপূর্বক সাক্ষর নেওয়া

মাদকবিরোধী অভিযানে গুলি ছুড়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন—এসআরবি। বাহিনীর দাবি, আত্মরক্ষার জন্য আকাশের দিকে চারটি গুলি ছোড়া হয়েছিল। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন কারখানাশ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়া। কিন্তু তাঁর শরীরে প্রাণঘাতী গুলিটি কার অস্ত্র থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

কারখানাশ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়ার মৃত্যু ঘিরে উঠেছে স্বাধীন তদন্তের দাবি
কারখানাশ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়ার মৃত্যু ঘিরে উঠেছে স্বাধীন তদন্তের দাবি

মাদকবিরোধী অভিযানে গুলি ছুড়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন—এসআরবি। বাহিনীর দাবি, আত্মরক্ষার জন্য আকাশের দিকে চারটি গুলি ছোড়া হয়েছিল। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন কারখানাশ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়া। কিন্তু তাঁর শরীরে প্রাণঘাতী গুলিটি কার অস্ত্র থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ। নিহতের পরিবার বলছে, গুলি করেছে কে, তা তারা জানে না। অথচ হত্যা মামলার এজাহারে মাদক কারবারিদের গুলিতে মারুফের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। নিহতের মায়ের ভাষ্য, থানায় তাঁর কাছ থেকে একটি কাগজে টিপসই নেওয়া হয়েছে; সেখানে কী লেখা ছিল, তা তিনি জানতেন না।

গত মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর সিটি পল্লি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। মৃত্যুর পর অভিযান, এজাহার এবং পরিবারের বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি—এইচআরএসএস।

এক নজরে: যে দশটি প্রশ্নের জবাব দরকার

প্রতিবেদনের যে বিষয়গুলো বিতর্কিত এবং জবাবদিহি দাবি করে—

  1. এসআরবি বলছে ‘ফাঁকা গুলি’, একই ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু। বাহিনী গুলি চালানোর কথা স্বীকার করেছে; কিন্তু প্রাণঘাতী গুলিটি কার অস্ত্র থেকে এসেছে, তা নিশ্চিত হয়নি।
  2. পরিবার ঘাতককে চেনে না, এজাহারে দায় মাদক কারবারিদের। স্বজনেরা গুলিবর্ষণকারীকে শনাক্ত করতে না পারলেও তাঁদের মামলায় নির্দিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে বর্ণনা কীভাবে এল?
  3. মায়ের অভিযোগ—কী লেখা ছিল না জানিয়েই টিপসই নেওয়া হয়েছে। এটি মামলার বক্তব্য পরিবারের সম্মতিতে লেখা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন তোলে। তবে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া প্রমাণিত নয়।
  4. এক কর্মকর্তা অভিযান স্বীকার করছেন, অন্য কর্মকর্তা দল পাঠানোর কথা অস্বীকার করেছেন। এই বক্তব্যগুলোর প্রেক্ষাপট এবং কোন দল অভিযানে ছিল, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
  5. বাহিনীর হিসাবে চার সদস্য ও চারজন আটক; প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ছয়জন ও তিনজনকে হাতকড়া। অভিযানের মৌলিক বিবরণেও অমিল রয়েছে।
  6. ‘আকাশের দিকে গুলি’ বনাম প্রত্যক্ষদর্শীদের গুলিবর্ষণের বর্ণনা। বাহিনীর বক্তব্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবির সত্যতা নির্ধারণে অস্ত্র, গুলি, খোসা এবং ভিডিও প্রমাণ পরীক্ষা জরুরি।
  7. গুলির আঘাত কোথায়—গলা, কাঁধ নাকি বুক? মা, এজাহার ও প্রাথমিক সংবাদে আলাদা বর্ণনা এসেছে। চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের নথিই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
  8. মৃত্যুর পর প্রায় ৪০ জন আটক; সাধারণ শ্রমিকদের হয়রানির অভিযোগ। নিহতের স্বজনেরা বলছেন, ধরপাকড়ে নিরীহ মানুষও পড়ছেন। পুলিশ বলছে, যাচাই চলছে।
  9. এসআরবির ওপর হামলার পর বস্তি উচ্ছেদে আরও কঠোর অবস্থান। একজনের মৃত্যুর তদন্তের মধ্যে পুরো এলাকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদের বিষয়টি সামনে আসা গুরুতর বিতর্কের জায়গা।
  10. র‍্যাবের পরিবর্তে এসআরবি—জবাবদিহিতে কী পরিবর্তন এল? নতুন কাঠামোর স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর হয়েছে কি না, প্রশ্ন তুলেছে এইচআরএসএস।

কাজ থেকে ফিরেছিলেন, খাবার খাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন

মারুফ অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। তাঁর বাবা আবদুর রশিদ মারা গেছেন। মা সেলিনা বেগম অন্যের বাসায় কাজ করেন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে মারুফ ছিলেন সবার ছোট। মা ও ছেলের আয়েই সংসার চলত বলে পরিবার জানিয়েছে।

স্ত্রী মীম আক্তার রুনার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেলে কাজ থেকে বাসায় ফিরে পোশাক বদলান মারুফ। বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আবার ঘরে আসেন। ক্ষুধার কথা জানিয়ে স্ত্রীকে রান্না করতে বলেন। এরপর আবার বাইরে যান।

পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, গোলাগুলির শব্দ শুনে ঘটনাটি দেখতে গিয়ে মারুফ গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মীমের দাবি, তাঁর স্বামী মাদক সেবন করতেন না এবং কারও সঙ্গে বিরোধেও জড়াতেন না। মায়ের ভাষ্য, ছেলের বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল না।

এসআরবি বলছে হামলা, অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা

এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, সাদা পোশাকে চার সদস্যের একটি দল মাদকবিরোধী অভিযানে ধলপুরে যায়। ২৪৫টি ইয়াবা ও ১৩৯ পুরিয়া হেরোইনসহ চারজনকে আটক করা হয় বলে দাবি তাঁর।

অধিনায়কের ভাষ্য, আটকের পর লোকজন জড়ো হয়ে সদস্যদের ওপর হামলা করে। তাঁদের মারধর, মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া এবং অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। তখন সদস্যরা চারটি গুলি ছোড়েন। হামলাকারীদের দিক থেকেও গুলি চালানো হয় বলে দাবি করেছেন তিনি।

তবে এসআরবির গুলিতে মারুফের মৃত্যু হয়েছে কি না—এ প্রশ্নে বাহিনী বলেছে, তদন্ত ছাড়া তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

অভিযান নিয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এক নয়

ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সদস্যদের ওপর হামলা এবং অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার মুখে তাঁরা গুলি ছোড়েন।

একই প্রতিবেদনে এসআরবি-১০ লালবাগ ক্যাম্পের উপসহকারী পরিচালক হুমায়ুন আহমেদের বক্তব্য এসেছে। তিনি ওই এলাকায় অভিযানে কোনো দল পাঠানোর কথা অস্বীকার করেন।

প্রতিবেদনটিতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে চারজনের পরিবর্তে এসআরবি সদস্য পরিচয় দেওয়া ছয়জনের উপস্থিতি এবং চারজনের পরিবর্তে তিনজনকে হাতকড়া পরানোর বর্ণনাও রয়েছে। ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর দুজন গুলি চালান বলে তাঁদের দাবি। এসব বর্ণনার পার্থক্য স্বাধীনভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।

মা জানেন না ঘাতক কে, এজাহারে দায় নির্দিষ্ট

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যা মামলার বাদী হিসেবে মারুফের মা সেলিনা বেগমের নাম রয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, মাদক কারবারি ও দুর্বৃত্তরা এসআরবিকে লক্ষ্য করে গুলি চালান; তাঁদের প্রতিহত করতে বাহিনীর সদস্যরা আকাশের দিকে গুলি ছোড়েন।

কিন্তু মা ও অন্য স্বজনেরা গুলিবর্ষণকারীর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে তাঁদের নামে করা মামলায় এই বর্ণনা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সেলিনা বেগমের অভিযোগ, বুধবার দুপুর ১২টার দিকে থানায় যাওয়ার পর তাঁকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হয়। এরপর একটি কাগজে টিপসই নেওয়া হয়। সেখানে কী লেখা ছিল, তিনি জানতেন না। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মামলা হওয়ার বিষয়টিও তাঁকে জানানো হয়নি বলে তাঁর দাবি।

এটি না জানিয়ে টিপসই নেওয়ার অভিযোগ। শারীরিক বলপ্রয়োগ বা হুমকি দিয়ে টিপসই নেওয়া হয়েছিল কি না, প্রকাশিত তথ্য থেকে তা নিশ্চিত করা যায়নি।

গুলির আঘাতের বর্ণনায় অমিল

মারুফের মা বলেছেন, ছেলের গলায় গুলি লেগেছিল। এজাহারে ডান কাঁধে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা রয়েছে। ঘটনার দিনের সমকালের প্রতিবেদনে স্বজনের বরাতে বুকের ডান পাশে গুলি লাগার বর্ণনা পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে বয়সও ২০ বলা হয়েছে; অন্য প্রতিবেদনে ১৭ বা ১৮ এসেছে। এই অমিলের কারণে বয়স বা ক্ষতস্থানের কোনো একটি বর্ণনাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া যায় না।

কার গুলি লেগেছিল, গুলির প্রবেশপথ কোথায় এবং কোন দিক থেকে তা এসেছিল—এসব নির্ধারণে প্রয়োজন ময়নাতদন্ত, উদ্ধার করা গুলি বা খোসার পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট অস্ত্রের সঙ্গে ব্যালিস্টিক মিল।

মৃত্যুর পর ধরপাকড়, উচ্ছেদের আশঙ্কা

মারুফের মৃত্যুর পর ধলপুরে নতুন করে অভিযান শুরু হয়। বোন রোকসানা আক্তারের অভিযোগ, মাদক কারবারের অভিযোগে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকেও ধরে নেওয়া হচ্ছে। ভাই হারানোর শোকের পাশাপাশি এলাকা ছাড়তে হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামি জানিয়েছেন, পুলিশ ও এসআরবির যৌথ অভিযানে প্রায় ৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। যাচাইয়ের পর কয়েকজনকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বলে জানান তিনি।

একই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, ওই বস্তি উচ্ছেদের পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। পুনর্বাসনের প্রশ্নে তা এগোয়নি। এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনার পর উচ্ছেদের বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য। ফলে প্রাণহানির তদন্তের পাশাপাশি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও বাসস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তিন মামলা, কিন্তু প্রাণঘাতী গুলির উত্তর কোথায়?

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় হত্যা, মাদক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে তিনটি মামলা হয়েছে। হত্যা মামলার তদন্ত অন্য দুটি মামলা থেকে আলাদাভাবে করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে মামলা হওয়ার অর্থ গুলিবর্ষণকারীর পরিচয় নির্ধারিত হয়ে যাওয়া নয়। পরিবারের বক্তব্য ও এজাহারের বর্ণনায় অমিল কেন, সেটিও তদন্তের বিষয়।

নাম বদলের পর জবাবদিহির পরীক্ষা

র‍্যাবের পরিবর্তে এসআরবি প্রতিষ্ঠার সরকারি ব্যবস্থায় আগের বাহিনীর সংশ্লিষ্ট জনবল, সম্পদ ও দায়দায়িত্ব নতুন ইউনিটে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

এইচআরএসএস প্রশ্ন তুলেছে, নাম পরিবর্তনের সঙ্গে কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে কি না। সংগঠনটির বিবৃতিতে আগের দিন আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ প্রসঙ্গের বক্তব্য নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তবে সেই বক্তব্যের সঙ্গে মারুফের মৃত্যুর সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সংগঠনটি সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরে স্বাধীন তদন্ত, ময়নাতদন্ত ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফল সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ ও অভিযানসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত চলাকালে অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব থেকে সাময়িক প্রত্যাহার, পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা, দায়ীদের বিচার এবং ক্ষতিপূরণের দাবি করেছে।

মারুফের মৃত্যুতে এখনো কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের গুলির দায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু অভিযানে গুলি চালানোর স্বীকৃতি, কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং মায়ের অজানা এজাহারের বর্ণনা—প্রতিটি বিষয়ই স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করে। পরিবারের সামনে এখন প্রশ্ন: ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা তাঁরা জানতে পারবেন কি না, আর তাঁদের নামে লেখা মামলায় তাঁদের নিজের বক্তব্যই যথাযথভাবে জায়গা পেয়েছে কি না।