ডেইলি বাংলাগ্রাম

সার ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, বিএনপির তৃণমূলে ক্ষোভ

কুমিল্লায় নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তালিকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম থাকা, কৃষিমন্ত্রীর শ্যালকের দুই বন্ধুর ডিলারশিপ পাওয়া এবং কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দিন জসিমের ব্যক্তিগত সহকারীকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

সার ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, বিএনপির তৃণমূলে ক্ষোভ

স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ৩০টির বেশি সার ডিলারশিপ পেয়েছেন। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছে।

‘আমার দেশ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিলারশিপ পেতে আবেদনকারীদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী এরশাদ আলম।

তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান প্রত্যেক ডিলারের কাছ থেকে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চান্দিনার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে নয়টিতে আওয়ামী লীগ নেতারা এবং পাঁচটিতে বিএনপি নেতারা ডিলারশিপ পেয়েছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, নীতিমালার বাইরে তিনি কোনো কাজ করেননি। নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কৃষিমন্ত্রীর শ্যালকের দুই বন্ধুর ডিলারশিপ

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার দক্ষিণ দুর্গাপুর ইউনিয়নে মাসুদ করিম মোহন এবং আমড়াতলী ইউনিয়নে আয়রা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আশরাফুল ইসলাম সোহেল সার ডিলারশিপ পেয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অভিযোগ, তারা কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াছিনের শ্যালক নিজাম উদ্দিন কায়সারের বন্ধু।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্যসচিব ফরিদ উদ্দিন শিবলু। আদর্শ সদর ও সিটি করপোরেশন এলাকার ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘কুমিল্লা-৬-এ সারের ডিলার, মন্ত্রী সাহেবের (কৃষিমন্ত্রী) লোক কি এ কয়েকজন, বাকিরা কার খালু?’

অভিযোগের বিষয়ে নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, যারা ডিলারশিপ পেয়েছেন, তারা বিএনপির ত্যাগী নেতা। এ ক্ষেত্রে কারও হস্তক্ষেপ নেই।

এমপির ব্যক্তিগত সহকারীর নামও তালিকায়

বুড়িচংয়ের বাকশিমুল ইউনিয়নে সার ডিলারশিপ পেয়েছেন কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দিন জসিমের ব্যক্তিগত সহকারী মোশাররফ হোসেন। এ ছাড়া ষোলনল, ময়নামতি ও ভারেল্লা দক্ষিণ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।

বুড়িচং পৌরসভায় ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেনের ভাগনে বাবুল আলম।

এ বিষয়ে সংসদ সদস্য জসীম উদ্দিন জসিম বলেন, মোশাররফ হোসেন আবেদন করেছেন কি না, তা তিনি জানেন না। ডিলারশিপের জন্য তিনি কোনো তদবিরও করেননি।

অন্যদিকে ভারেল্লা দক্ষিণ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি বিল্লাল হোসেন সেন্টু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেও নিবেদিত কর্মীরা শেষ পর্যন্ত ১০ লাখ টাকার কাছাকাছি এবং আওয়ামী লীগের কাছে হেরে গেলেন।

আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের নিয়োগের অভিযোগ

মনোহরগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সার ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার জাহান দোলন বলেন, দলের নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে সার ডিলার দেওয়া হয়েছে। তবে কার নির্দেশে এসব নিয়োগ হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি।

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে দুলালপুর ইউনিয়নে মাইশা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নুরে আলম বিল্লাল ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা বলে দাবি করেছেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম।

নজরুল ইসলামের ভাষ্য, বাকি সাত ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ নিয়ে আপত্তি না থাকলেও দুলালপুরে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া রাজাপুর ইউনিয়নে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সার্ভেয়ার বাকিরুল ইসলাম বাহাদুরের ভাই সাদেকুর রহমান এবং ষোলনল ইউনিয়নে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য আফজল বেগ ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাদেকুর রহমান আওয়ামী লীগ-সমর্থক বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়া বিএনপি নেতাও পেলেন ডিলারশিপ

জামালপুরের বকশীগঞ্জে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাওয়া এক বিএনপি নেতার সার ডিলারশিপ পাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

মেরুরচর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাদার মালিকানাধীন মেসার্স শান্ত ট্রেডার্সকে সার ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত রোববার সকালে বকশীগঞ্জ পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নের ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এক মতবিনিময় সভায় সাইফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার পর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মানিক সওদাগর তাকে মেরুরচর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করেন।

তবে সাইফুলের দাবি, পরে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং তাকে স্বপদে বহাল রাখা হয়।

তিনি বলেন, সার ডিলারশিপ পেতে মেরুরচর ইউনিয়ন থেকে ১৪ জন আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্য থেকে কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়োগ দিয়েছে।

সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে এসব অভিযোগের ঘটনায় বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ বাড়ছে। দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি যোগ্যতা ও নির্ধারিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।