ডেইলি বাংলাগ্রাম

এলপিজি সংকট বাড়ছেই, ১৩ দিনেও মাঠের তথ্য পায়নি সরকার

এলপিজি সংকটের কারণ ও বাজার পরিস্থিতি জানতে জেলা প্রশাসকদের কাছে তথ্য চেয়েছিল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। কিন্তু ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও সেই তথ্য পায়নি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রিসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এতে চলমান সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এলপিজি সংকট বাড়ছেই, ১৩ দিনেও মাঠের তথ্য পায়নি সরকার

সরকারি সূত্রের দাবি, গত কয়েক মাসে দেশের চাহিদার তুলনায় বেশি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি হয়েছে। তারপরও বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না সহজে। কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।

এলপিজির এমন সংকটে বাজার তদারকি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যকারিতা ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অন্যদিকে বিইআরসির বক্তব্য, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তারা নির্দেশনা দিতে পারে, তবে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং বাজার তদারকিতে দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এলপিজি এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। তাই এ খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার, আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, জ্বালানি খাতে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ এখনো রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

১৩ দিনেও জেলা প্রশাসকদের তথ্য পায়নি মন্ত্রণালয়

জ্বালানি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে সরকার একাধিকবার বৈঠক করেছে। প্রতিবারই ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগ জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে নিজ নিজ জেলার এলপিজি সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে নির্দিষ্ট ছকে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

নির্দেশনায় এলপিজির বাজারমূল্য তদারকিতে জেলা প্রশাসনের চলমান কার্যক্রম এবং সিলিন্ডারের বিক্রয়মূল্যের তথ্য চাওয়া হয়েছিল। তবে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও মন্ত্রণালয় মাঠপর্যায়ের তথ্য পায়নি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এলপিজি সংকটসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি

এলপিজির দাম বাড়লেও বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে জানিয়েছেন বিইআরসির কর্মকর্তারা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের ভিত্তিতে গত আট মাসে এলপিজির দাম ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

বিইআরসির তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ছিল ১১৩ টাকা। সে সময় ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। গত ৪ অক্টোবর প্রতি কেজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১৫৩ টাকা। এতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।

নির্ধারিত দামের বেশি দরে এলপিজি বিক্রি করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছে বিইআরসি। একই সঙ্গে কালোবাজারি, মজুতদারি ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সরকারকে বাজার তদারকি জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি।

তবে নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের অভিযোগ, খুচরা ব্যবসায়ীদের অগ্রিম টাকা দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকার বাসিন্দা আরমান হোসেন জানান, তাদের এলাকায় পাইপলাইনে গ্যাস নেই। রান্নার একমাত্র ভরসা এলপিজি। সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হওয়ার পর কয়েকটি দোকানে খুঁজেও তা পাননি তিনি। তিন দিন চেষ্টা করে অতিরিক্ত ৬০০ টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। এখন খরচ সামলাতে একবেলা রান্না করে দুই বেলা খাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা লোকমান হোসেন বলেন, দোকানদার যে দাম চান, সেই দামেই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। বেশি টাকা না দিলে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

১৫ ও ১৬ অক্টোবর দোকান বন্ধের ঘোষণা

তথ্য সংগ্রহ ও তল্লাশির নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে সিলিন্ডার বিক্রিসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।

গত সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি সেলিম খান বলেন, গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ও সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বারবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এর প্রতিবাদে দুই দিন সব দোকান বন্ধ রাখা হবে। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাসিরুদ্দিন নাসিমের অভিযোগ, মাত্র পাঁচটি কোম্পানির হাতে এলপিজি সিলিন্ডারের বিপণনব্যবস্থা জিম্মি হয়ে আছে। এসব কোম্পানির মাধ্যমে একতরফাভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে রয়েছে, প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ কমিশন নির্ধারণ, একই মাসে একাধিকবার দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিইআরসির ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা এবং দীর্ঘদিন গ্যাস সরবরাহে ব্যর্থ কোম্পানির সিলিন্ডার পুনরায় গ্যাস ভরার ব্যবস্থা করা।

এ ছাড়া কোম্পানির চালানে প্রকৃত দাম উল্লেখ, ন্যায্য পরিবহনভাড়া নিশ্চিত, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সিলিন্ডার পরিবহনকারী যানবাহনকে পুলিশি হয়রানি ও মামলা থেকে সুরক্ষা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জরিমানা আরোপ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।

চাহিদার চেয়ে বেশি আমদানি, তারপরও সংকট

বিইআরসির তথ্যমতে, দেশে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর ৮০ শতাংশ রান্নার কাজে, ১২ শতাংশ শিল্পে এবং ৮ শতাংশ যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি করা হয়। সেপ্টেম্বরে আমদানি হয় দেড় লাখ টনের বেশি। দেশে ২৯টি এলপিজি কোম্পানি চালু থাকলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি।

জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র চারটি কোম্পানি দেশের মোট এলপিজি বাজারের ৬৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

অন্যদিকে আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের দাবি, দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল মোক্তাদিরের সঙ্গে বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) বৈঠক হয়। সেখানে ব্যবসায়ী নেতারা দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলে দুই মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন।

সরকারের পক্ষ থেকেও এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।

জ্বালানিমন্ত্রী জানান, দেশে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করা হলেও কেন বাজারে সংকট দেখা দিচ্ছে এবং কেন বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে, তা জানতে জেলা প্রশাসকদের তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো এলাকায় সরবরাহ কম থাকলে সেখানে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলমের মতে, সংকটের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। বাজারে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার দাবি এবং বাস্তবে সিলিন্ডার না পাওয়া ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।