ডেইলি বাংলাগ্রাম

কে এই ‘নন-পলাতক আওয়ামী লীগ’-এর সভাপতি? দুই হত্যা মামলায় আসামি কামাল উদ্দীন

আনোয়ার হত্যা মামলায় ছয় নম্বর ও জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় তিন নম্বর আসামি থাকার কথা নিজেই জানিয়েছেন অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দীন। আওয়ামী লীগের সাবেক এই যুবলীগ নেতার রাজনৈতিক অতীত, মনোনয়ন-বাণিজ্য নিয়ে অভিযোগ এবং নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ঘিরে আলোচনা।

কে এই ‘নন-পলাতক আওয়ামী লীগ’-এর সভাপতি? দুই হত্যা মামলায় আসামি কামাল উদ্দীন

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন ও প্রাণহানির ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। তাঁর সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। কেউ আত্মগোপনে চলে যান, আবার কেউ বিদেশে অবস্থান করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা চালান।

এরপর থেকে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন দলটিরই একাংশের নেতাকর্মী। তাঁদের মধ্যে আলোচনায় আসেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাসিন্দা ও সাবেক যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ কামাল উদ্দীন।

ফেসবুকে আঞ্চলিক ভাষায় আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের গালিগালাজ ও সমালোচনা করে ভাইরাল হন তিনি। কখনো শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সমালোচনা, কখনো বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান—এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি বাড়তে থাকে কামালের।

একপর্যায়ে তিনি ঘোষণা দেন, আওয়ামী লীগ এখন দুই ভাগে বিভক্ত—একটি ‘পলাতক আওয়ামী লীগ’, অন্যটি ‘নন-পলাতক আওয়ামী লীগ’। গত ৮ অক্টোবর নিজেকে ‘বাংলাদেশ নন-পলাতক আওয়ামী লীগ’-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি ঘোষণা করেন তিনি। পাশাপাশি দেশের ৬৪ জেলায় সংগঠনটির কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরসের জন্ম দেওয়া এই আইনজীবীর রাজনৈতিক অতীত ঘিরেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ ও বিতর্ক। বিশেষ করে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সংঘটিত দুটি আলোচিত হত্যা মামলায় আসামি থাকার কথা তাঁর নিজের মুখে উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।

দুই হত্যা মামলায় আসামি থাকার কথা জানিয়েছেন নিজ মুখেই

"পাবলিক ইনভেস্টিগেশন নিউজকে" দেওয়া একটি অনলাইন সাক্ষাৎকারে অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দীন দুটি হত্যা মামলায় আসামি থাকার কথা জানিয়েছেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন—

“চট্টগ্রামের দুটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড—আনোয়ার হত্যা, আমি ছয় নম্বর আসামি এবং জাহাঙ্গীর হত্যায় তিন নম্বর আসামি ছিলাম।”

সাতকানিয়া কলেজে আনোয়ার হত্যাকাণ্ড

১৯৯৫ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া সরকারি কলেজে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা আনোয়ার হোসাইন নিহত হন।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ওই বছরের ২৩ অক্টোবর কলেজে ছাত্রশিবিরের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। এতে কলেজের বিএ তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসাইন নিহত হন। হামলায় ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের মামলায় নিজেকে ছয় নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে কামাল উদ্দীনের সাক্ষাৎকার থেকে উদ্ধৃতি পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীর আলম সবুজ হত্যাকাণ্ড

সাতকানিয়া সরকারি কলেজের আরেক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার ছাত্রশিবিরের তৎকালীন কলেজ শাখা সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম সবুজ।

প্রাপ্ত বিবরণে বলা হয়েছে, কলেজ ক্যাম্পাসে তাঁকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।

জাহাঙ্গীর হত্যার ঘটনাটি ৬ এপ্রিল ২০০৬ সালে সংঘটিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এই হত্যা মামলায় নিজেকে তিন নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে কামাল উদ্দীনের সাক্ষাৎকার থেকে উদ্ধৃতি পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে বিতর্ক

আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দীন নদভীর সঙ্গে কামাল উদ্দীনের রাজনৈতিক ও পেশাগত সম্পর্ক নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC) ঘিরে নদভীর প্রভাব বিস্তারের সময় কামাল উদ্দীন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানেল আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পান।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দুটি পুলিশি নথির ছবিতে অ্যাডভোকেট মো. কামাল উদ্দীনকে IIUC-সংশ্লিষ্ট বিরোধ নিয়ে দায়ের করা একটি মামলার অভিযোগকারী হিসেবে দেখা যায়।

মূলত প্রতিপক্ষকে হয়রানি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিপত্য দখলের নিল নকশার জন্য এই মামলাটি করেন তিনি।

পুলিশি নথি ১

পুলিশি নথি ২

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কামালের অতীত

অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দীন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি আইন পেশার পাশাপাশি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চট্টগ্রাম জেলা আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০২২ সালে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে যুবলীগের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগ

২০২২ সালে সাতকানিয়ার সোনাকানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন চেয়েছিলেন কামাল উদ্দীন।

দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৫ লাখ টাকার একটি ব্যাংক চেকের ছবি প্রকাশ করে আলোচনায় আসেন তিনি।

কামালের অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হোসেন কবির তাঁর কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মনোনয়ন না পাওয়ার পর প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কামাল। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন-বাণিজ্য নিয়ে তাঁর অভিযোগ সে সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।

পলাতক নেতাদের সমালোচনা করে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম

৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হন কামাল উদ্দীন। তাঁর বক্তব্য, বিদেশে অবস্থানরত নেতারা দেশে থাকা কর্মীদের আন্দোলনে নামার আহ্বান জানালেও তাঁদের বিপদের সময় পাশে দাঁড়াচ্ছেন না।

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আওয়ামী লীগকে সংগঠিত রাখতেই ‘নন-পলাতক আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়েছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সাড়া পাওয়ার দাবিও করেন তিনি।

কামাল উদ্দীনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চান।

কিন্তু তাঁর নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি অতীতের দুটি হত্যা মামলায় আসামি থাকার বক্তব্য, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং IIUC ঘিরে তাঁর কথিত ভূমিকা—সব মিলিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন।

পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সমালোচনা করে পরিচিতি পাওয়া কামাল উদ্দীনের অতীতও তাই জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দুটি হত্যা মামলায় আসামি থাকার বিষয়ে তাঁর নিজের বক্তব্যের পর মামলাগুলোর অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির তথ্য জানার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।